শনিবার ২৯শে জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২৬শে জমাদিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

আর্জেন্টিনার সর্বকালের সেরা একাদশে মেসি-ম্যারাডোনা

প্রকাশঃ ০৫ জানুয়ারি, ২০১৬

ডান প্রান্তে বল পেলেন লিওনেল মেসি। সম্মোহনী দৌড়ে দু-তিন ডিফেন্ডারকে ছিটকে ফেলে চলে এসেছেন প্রতিপক্ষ ডি বক্সের কোনায়। ডিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে ওয়ান-টু খেলে ঢুকে পড়লেন বক্সে। কাট-ব্যাক…জোরালো শটে সেটিকে জালে জড়িয়ে দিলেন গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা!

মেসি, ম্যারাডোনা, বাতিস্তুতা…ভাবছেন পাগলের প্রলাপ? কিংবা কোনো ধারাভাষ্যকার ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে ধারাভাষ্য দিচ্ছেন? এমনটা মনে হওয়া দোষের কিছু নয়। তবে এভাবে কল্পনার জগতে ‘এমন হলে কেমন হতো’ ভাবনাটা এনে দিচ্ছে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)। মেসি, ম্যারাডোনা, বাতিস্তুতাকে নিয়ে আর্জেন্টিনার সর্বকালের সেরা একাদশ ঘোষণা করেছে এএফএ।

এমন একাদশে মেসি-ম্যারাডোনা থাকছেন, সেটা তো বলে দেওয়াই যায়। একজন ফিফা-স্বীকৃত বিংশ শতাব্দীর সেরা দুই ফুটবলারের একজন, অনেকের কাছে সর্বকালের সেরা। অন্যজন এই মুহূর্তে ফুটবল দুনিয়ার সবচেয়ে বড় দুই বিজ্ঞাপনের একজন, ইনিও অনেকের কাছে সর্বকালের সেরা কিংবা সেই মানের কাছাকাছি। বিশ্বেরই সর্বকালের সেরা যেকোনো একাদশে চোখ বন্ধ করে দুজনের জায়গা হয়ে যাবে, সেখানে আর্জেন্টিনার সর্বকালের সেরা একাদশ ম্যারাডোনা ও মেসিকে ছাড়া হয় কী করে!

সেটি হলোও না। ইন্টারনেটে হালের রীতি হ্যাশট্যাগ দিয়ে নির্বাচিত যে খেলোয়াড়দের (#চোজেনওয়ানস) দল ঘোষণা করেছে এএফএ, তা আসলেই তাদের সর্বজয়ী একাদশ। বিতর্ক করার কোনো সুযোগই নেই। হ্যাঁ, চাইলে আলফ্রেডো ডি স্টেফানোর না থাকা নিয়ে বিতর্ক করা যায়, কিন্তু ফুটবলের অন্যতম সেরা এই খেলোয়াড় তো আকাশি-নীল জার্সিতে খেলেছেনই যে মাত্র ৬টি ম্যাচ।

একাদশে বর্তমান খেলোয়াড়দের মধ্যে আছেন শুধু মেসি। বাকি সবাই বুট জোড়া তুলে রেখেছেন বহু আগে। ৪-৩-৩ ফরমেশনে আক্রমণে মেসি ও বাতিস্তুতার সঙ্গে থাকছেন মারিও কেম্পেস। মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের আক্রমণ নষ্ট করে দিতে থাকছেন ফার্নান্দো রেডোন্ডো। তাঁর সঙ্গে থাকছেন মিগুয়েল অ্যাঙ্গেল ব্রিন্দিসি। আর তাঁদের একটু সামনে, মাঝমাঠ ও আক্রমণের মধ্যে সমন্বয় এনে দিতে থাকছেন—ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা।

রক্ষণের চারজন হচ্ছেন হাভিয়ের জানেত্তি, রবার্তো পারফুমো, ড্যানিয়েল প্যাসারেলা ও আলবার্তো তারান্তিনি। গোলবারের নিচে ভরসা জোগাবেন উবালদো ফিলোল।

ম্যারাডোনাকে তাঁর কীর্তির জন্য চেনেন, মেসিকে না চেনাও ‘অপরাধ’। জানেত্তি-বাতিস্তুতা তো এই কদিন আগে খেলে গেছেন। আর মারিও কেম্পেসের নাম শোনার কথা ১৯৭৮ বিশ্বকাপের কারণে। ফুটবলের ইতিহাস নিয়ে খুব বেশি ঘাঁটাঘাঁটি না থাকলে একাদশের বাকি খেলোয়াড়দের খুব বেশি চেনার কথা নয়। পাঠকদের সুবিধার্থে তাই একাদশের সবার স্বল্প পরিচিতি তুলে ধরা হলো—

উবালদো ফিলোল: আর্জেন্টিনার হয়ে ১৯৭৪,১৯৭৮ ও ১৯৮২ বিশ্বকাপে খেলেছেন।’ ৭৮ বিশ্বকাপে হয়েছিলেন সেরা গোলরক্ষক। আকাশি-নীল জার্সিতে ৫৮টি ম্যাচ খেলা এই গোলরক্ষকের নামেই বর্তমান সময়ের আর্জেন্টাইন প্রিমিয়ার লিগের সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কারের নাম দেওয়া হয়েছে—‘উবালদো ফিলোল অ্যাওয়ার্ড’।

হাভিয়ের জানেত্তি: আর্জেন্টিনার জার্সিতে ১৪৫টি ম্যাচ খেলেছেন, যা দেশের হয়ে সর্বোচ্চ। রক্ষণের দুই প্রান্তে, ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে কিংবা রাইট উইংয়ে—জানেত্তি সব জায়গাতেই ছিলেন সমান পারদর্শী। দুটি বিশ্বকাপে খেলেছেন।

রবার্তো পারফুমো: ‘মার্শাল’ ডাকনামের এই খেলোয়াড়টিকে তাঁর সময়ের সেরা ডিফেন্ডারদের একজন মনে করা হতো। প্রতিপক্ষকে কড়া মার্কিংয়ে রাখার জন্য বিখ্যাত পারফুমো আর্জেন্টিনার হয়ে খেলেছেন ৩৭টি ম্যাচ।

ড্যানিয়েল প্যাসারেলা: ১৯৭৮ বিশ্বকাপ জয়ী দলের অধিনায়ক। তিনটি বিশ্বকাপে খেলেছেন। হল্যান্ডের ডিফেন্ডার রোনাল্ড কোম্যান তাঁর রেকর্ড ভাঙার আগ পর্যন্ত ডিফেন্ডারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ড ছিল তাঁর (৪৫১ ম্যাচে ১৩৪ গোল)।

আলবার্তো তারান্তিনি: ১৯৭৮ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য। স্ট্যামিনা ও স্পিডের সঙ্গে আক্রমণাত্মক মেজাজের জন্যও বেশ ‘খ্যাতি’ ছিল তাঁর।

ফার্নান্দো রেডোন্ডো: মূলত স্প্যানিশ ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদেই ক্লাব ক্যারিয়ারের বড় অংশ কাটিয়েছেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। প্রতিপক্ষের আক্রমণ নষ্ট করার পাশাপাশি নিচ থেকে খেলা গড়ে দিতেও বেশ ভালো পারতেন। আর্জেন্টিনার সর্বশেষ আন্তর্জাতিক সাফল্য ১৯৯৩ কোপা আমেরিকা জয়ী দলের সদস্য।

মিগুয়েল অ্যাঙ্গেল ব্রিন্দিসি: আর্জেন্টিনার হয়ে ৪৬ ম্যাচে ১৭ গোল। আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে চাপানো সেরা রাইট উইঙ্গারদের একজন মনে করা হয় ব্রিন্দিসিকে।

ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা: তাঁকে চেনানোর কিছু নেই। অধিনায়ক, নেতা, আদর্শ—ম্যারাডোনাই প্রথম ও শেষবার দেখিয়েছিলেন একা কীভাবে একটি দেশকে বিশ্বকাপ জেতানো যায়। সর্বকালের সেরা একাদশে পুরো দলের আক্রমণকে এক সুতোয় বেঁধে দেওয়ার দায়িত্বও পাচ্ছেন আর্জেন্টিনার হয়ে চারটি বিশ্বকাপ খেলা ম্যারাডোনা।

লিওনেল মেসি: পেছনে বল বাড়িয়ে দিচ্ছেন ম্যারাডোনা, সামনে প্রতিপক্ষ রক্ষণকে তছনছ করে দিচ্ছেন মেসি, কল্পনাটাকে ব্যাখ্যা করতে একটা বাক্যই যথেষ্ট-এর চেয়ে মোহনীয় দৃশ্য ফুটবলে আর কিছু হতে পারত না।

মারিও কেম্পেস: ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনাকে প্রথম বিশ্বকাপ জেতানোর পথে সর্বোচ্চ গোলদাতার গোল্ডেন বুট ও সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল দুটোই জিতেছিলেন কেম্পেস। এটিই তাঁকে এই দলে জায়গা করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা: দলে গোলস্কোরার চাই? ‘বাতিগোল’ আছে না! টেকনিক, ফিনিশিং, হেডিং, ফ্রি কিক-নিজের সময়ের সবচেয়ে পরিপূর্ণ স্ট্রাইকার ছিলেন বাতিস্তুতা। ৫৬ গোল নিয়ে আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ গোলদাতার সম্মানটা এখনও তাঁরই, যদিও মেসি (৪৯) তাতে হানা দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। সূত্র: এএফএ, এএস।