রবিবার ২৩শে জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২০শে জমাদিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

১১ বছরেও শেষ হয়নি বিচার, হতাশ কিবরিয়া পরিবার

প্রকাশঃ ২৭ জানুয়ারি, ২০১৬

নিজস্ব প্রতিবেদকঃছাত্রজীবনে ছিলেন অদম্য মেধাবী। পেশাগত জীবনে ছিলেন সবার থেকে এগিয়ে। রাজনীতিরও শুরু শীর্ষ থেকে। জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে চেষ্টা করতেন সবার পাশে থাকার। ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি শীতের বিকালে তিনি এসেছিলেন প্রিয় মানুষগুলোর কাছে। কিন্তু নির্মম গ্রেনেড হামলায় তাকে চলে যেতে হয়েছে পৃথিবী ছেড়ে। দেশ হারায় এক সূর্যসন্তান শাহ এএমএস কিবরিয়াকে।
আজ থেকে ১১ বছর আগের এই বেদনাবিদূর ঘটনা এখনও নাড়া দেয় সবাইকে। আলোচিত বৈদ্যের বাজার ট্র্যাজেডির কথা ভুলতে পারেননি কেউ। সেদিনের নির্মম হামলায় আহতরা এখনও কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। বিভীষিকাময় সেই দিনের কথা মনে করে আঁতকে উঠেন তারা।
বৈদ্যের বাজার ট্রাজেডি২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি বিকালে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বৈদ্যের বাজারে ঈদ পরবর্তী এক জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন তৎকালীন হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া। বিশাল মাপের এই মানুষটি সাধারণ জনগণের সাথে সহজেই মিশতে পারতেন বলে তার জনসভা ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। বক্তব্য শেষে যখন তিনি মঞ্চ থেকে নেমে সহকর্মীদের নিয়ে বৈদ্যের বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গেটে আসেন তখনই দিনের আলো নিভে প্রায় সন্ধ্যা। হঠাৎ করেই বিকট শব্দ। হুড়োহুড়িতে চারদিকে গগনবিদারী চিৎকার। আর্জেস গ্রেনেডের আঘাতে অনেকেই ক্ষতবিক্ষত। কারও দিকে কারও নজর দেয়ার সময় নেই। এমন সময় দূরে থাকার লোকজন ছুটে আসেন ঘটনাস্থলে। কিবরিয়াসহ আহতদের নিয়ে ছুটে যান হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে। মুখে মুখে খবর ছড়িয়ে পড়ে গোটা শহরে। হাসপাতালে তখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ঘটনার আকস্মিকতায় চিকিৎসকরাও তখন হতবিহ্বল। শাহ এএমএস কিবরিয়া ও তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহিরের প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছিল না। নেতাকর্মীরা তখন দিগি¦দিক ছুটছেন। স্থানীয় প্রশাসন ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় হেলিকপ্টারের জন্য। কিন্তু দ্রুত তা ব্যবস্থা করতে না পেরে সিদ্ধান্ত হয় অ্যাম্বুলেন্সে রওনা দেয়ার। একই অ্যাম্বুলেন্সে করে কিবরিয়া ও আবু জাহিরকে ঢাকার উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। পথিমধ্যে আরও একটি অ্যাম্বুলেন্স পেলে তাদেরকে আলাদাভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঢাকা যখন অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছায় তখন চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর মৃত্যুতে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে গোটা জাতি। হরতাল অবরোধে হবিগঞ্জ শহর কার্যত অচল হয়ে পড়ে। গ্রেনেড হামলায় শুধু শাহ এএমএস কিবরিয়া নন, তাঁর ভাতিজা শাহ মনজুরুল হুদা, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রহিম, আবুল হোসেন ও সিদ্দিক আলী প্রাণ হারান। আহত হন কমপক্ষে ৭৩ নেতাকর্মী।
কিবরিয়া হত্যা মামলা ও তদন্ত কার্যক্রম
এ ঘটনার পরদিন ২৮ জানুয়ারি তৎকালীন হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল মজিদ খান এমপি বাদী হয়ে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তে কাজ করে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা। কিন্তু মামলাটির স্বাভাবিক তদন্ত না হয়ে দলীয় বিবেচনায় পরিচালিত হতে থাকে।
সিআইডির তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সি আতিকুর রহমান মামলাটি তদন্ত করে ১০ জনের বিরুদ্ধে ওই বছরের ২০ মার্চ ১ম অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ওই অভিযোগপত্রে তৎকালীন জিয়া স্মৃতি ও গবেষণা পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আবদুল কাইয়ুম, জেলা বিএনপির কর্মী ও ব্যাংক কর্মকর্তা আয়াত আলী, কাজল মিয়া, জেলা ছাত্রদলের সহ-দপ্তর সম্পাদক সেলিম আহমেদ, জিয়া স্মৃতি গবেষণা পরিষদ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সাহেদ আলী, বিএনপি কর্মী তাজুল ইসলাম, জয়নাল আবেদীন জালাল, ইউনিয়ন বিএনপি নেতা জমির আলী, ওয়ার্ড বিএনপি নেতা জয়নাল আবেদীন মোমিন ও ছাত্রদল কর্মী মহিবুর রহমানকে অভিযুক্ত করা হয়। আব্দুল কাইয়ুমকে স্বীকারোক্তির জন্য ৪৭ দিন রিমান্ডে নেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।
অভিযোগপত্র দেয়ার পর মামলার বাদী ২০০৬ সালের ৩ মে সিলেট দ্রুতবিচার আদালতে নারাজি আবেদন করেন। আদালত তার আবেদন খারিজ করলে ১৪ মে তিনি হাইকোর্টে আপিল করেন। আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সরকারের প্রতি ‘কেন অধিকতর তদন্ত করা যাবে না’ মর্মে রুল জারি করেন। এই রুলের বিরুদ্ধে ২০০৬ সালের ১৮ মে লিভ টু আপিল করে সরকার। আপিল বিভাগ সরকারের আপিল খারিজ করেন। এরপর ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর এ মামলার অধিকতর তদন্ত শুরু হয়। দায়িত্ব দেয়া হয় সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলামকে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে তিনি ২০১১ সালের ২০ জুন আরও ১৪ জনকে আসামি করে এই আলোচিত মামলার অধিকতর তদন্তের অভিযোগপত্র দাখিল করেন। কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের সাড়ে ছয় বছর পর লুৎফুজ্জামান বাবর, মুফতি হান্নানসহ ২৪ জনকে আসামি করে অধিকতর তদন্তের অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। সম্পূরক চার্জশিটে ১ম ১০ জনের বাইরে অভিযুক্তরা হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান, লস্কর ই তৈয়বা সদস্য আব্দুল মজিদ কাশ্মীরি, সাবেক প্রতিমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, মহিউদ্দিন অভি, শাহেদুল আলম দিলু, সৈয়দ নাঈম আহমেদ আরিফ, ফজলুল আলম মিজান, মিজানুর রহমান মিঠু, মোহাম্মদ আব্দুল হাই, মোহাম্মদ আলী, মুফতি সফিকুর রহমান, বদরুল এনায়েত মো. বদরুল, বদরুল আলম মিজান।
২০১১ সালের ২৮ জুন কিবরিয়ার স্ত্রী আসমা কিবরিয়া চার্জশিটের ওপর হবিগঞ্জ জুডিসিয়াল আদালতে নারাজি আবেদন করেন। আবেদনে আসমা কিবরিয়া উল্লেখ করেন, যেহেতু তদন্তকারী কর্মকর্তার দাখিলকৃত অভিযোগপত্রে উল্লে¬খ রয়েছে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, চারদলীয় জোটের অন্যান্য মন্ত্রী ও নেতা কর্মীদের পরস্পর যোগসাজসে হরকাতুল জিহাদ সদস্যদের সহায়তায় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, সিলেটের মেয়র বদর উদ্দিন কামরানের ওপর দুই দফা হামলা, আওয়ামী লীগের এমপি জেবুন্নেছা হকের বাসায় গ্রেনেড হামলা, ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা, সুরঞ্জিত সেনের জনসভায় গ্রেনেড হামলা ও কিবরিয়ার ওপর বৈদ্যের বাজারে গ্রেনেড হামলা সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু অন্য কারও নাম অভিযোগপত্রে নেই। তাই তা যথাযথভাবে তৈরি হয়নি। এছাড়াও তৎকালীন জেলা প্রশাসক এমদাদুল হককে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মূল তথ্য উদঘাটন হবে বলে আসমা কিবরিয়া দাবি করেন।
তিনি আরও দাবি করেন, অভিযোগপত্রে দণ্ডবিধি ১১৪ ধারা সংযুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এই ধারা কার ওপর বর্তায় তা পরিষ্কারভাবে সামনে আসেনি। তার দৃঢ় বিশ্বাস, অভিযোগপত্রে যাদের নাম এসেছে এর বাইরে আরও অনেকেই জড়িত রয়েছেন।আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলার মূল নথি সিলেট দ্রুতবিচার ট্রাইবুনালে থাকায় বিচারক রাজিব কুমার বিশ্বাস উপনথির মাধ্যমে আবেদনটি সিলেটে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি হত্যাকাণ্ডের অধিকতর তদন্তের অভিযোগপত্রের নারাজি আবেদন গ্রহণ করেন সিলেটের দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক দিলীপ কুমার বণিক। তিনি সিনিয়র পুলিশ অফিসারের মাধ্যমে মামলার অধিকতর তদন্তের জন্য নির্দেশ দেন।৩য় সম্পূরক অভিযো২০১৪ সালের ১৩ নভেম্বর হবিগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রোকেয়া আক্তারের আদালতে কিবরিয়া হত্যা মামলার ৩য় সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করেন সিআইডি সিলেট অঞ্চলের সিনিয়র এএসপি মেহেরুন নেছা পারুল। অভিযোগপত্রে নতুন ১১ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অন্তর্ভুক্ত আসামিরা হলেন সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ পৌরমেয়র জি কে গউছ, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরী, মুফতি আব্দুল হাই, মুফতি তাজ উদ্দিন, মুফতি সফিকুর রহমান, মোহাম্মদ আলী, বদরুল, মহিবুর রহমান, কাজল আহমেদ, হাফেজ ইয়াহিয়া। একই সাথে পূর্বের চার্জশিটভুক্ত ইউসুফ বিন শরীফ, আবু বক্কর আব্দুল করিম ও মরহুম আহছান উল্লাহকে চার্জশিট থেকে অব্যাহতির আবেদন করেন। ৩ ডিসেম্বর মামলার শুনানিকালে অভিযোগপত্রে ত্রুটির কথা উল্লেখ করে সংশোধিত অভিযোগপত্র জমা দেয়ার আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২১ ডিসেম্বর সংশোধিত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে আদালত। একই সাথে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেয়া হয়। ২৭ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে ৩৫ জনকে আসামি ও ১৭১ জনকে সাক্ষী করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা মেহেরুন নেছা ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জের বৈদ্যের বাজারস্থ প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ইউনিয়ন পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতাদের ঈদ পুনর্মিলনী ও রাজনৈতিক সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার ঘোষণা হয়। এই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য শাহ এএমএস কিবরিয়াসহ স্থানীয় জেলা, উপজেলা পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত থাকবেন- এমন সংবাদ পাওয়ার পর বিপুল হুজি সদস্য বদরুল আলম মিজানকে এই সভায় গ্রেনেড নিক্ষেপের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতা কিবরিয়া ও অন্যান্য নেতাদেরকে হত্যা করার জন্য হাফেজ নিমুর কাছ থেকৈ গ্রেনেড আনার নির্দেশ দেয়। নির্দেশ মোতাবেক ওই বছরের ১৮ জানুয়ারি বদরুল আলম মিজান তার নিজের লাল রংয়ের মোটর সাইকেলটি ভগ্নিপতি মাওলানা কুতুব উদ্দিনের বাসা থেকে সংগ্রহ করেন। এই মোটর সাইকেলে তার পরিচিত রুহেল মাস্টারকে নিয়ে সুনামগঞ্জস্থ হাফেজ নিমুর দোকানের কাছে যান এবং দোকান থেকে অনতিদূরে মোটর সাইকেলসহ রুহেল মাস্টারকে দাঁড় করিয়ে রাখেন। বদরুল আলম মিজান হাফেজ নিমুর দোকানে যান এবং বিপুলের নির্দেশক্রমে নিমুর কাছ থেকে একটি গ্রেনেড গ্রহণ করেন। এই গ্রেনেডটি হেফাজত করে মোটর সাইকেলের কাছে আসেন। এরপর রুহেল মাস্টারকে গ্রেনেডটির কথা না জানিয়ে তাকে গ্রেনেডসহ ব্যাগটি রাখার জন্য দেন এবং বদরুল আলম মিজান মোটর সাইকেল চালিয়ে হবিগঞ্জে আসেন। হবিগঞ্জস্থ উমেদনগর টাইটেল মাদ্রাসার কাছে এসে রুহেল মাস্টারকে চলে যেতে বলেন। রুহেল মাস্টার জিদ ধরে যে, সে এতক্ষণ যে জিনিসটা বহন করেছে সেটা কী? তখন মিজান রুহেলকে নিয়ে উমেদনগর মাদ্রাসার দোতলায় যায় এবং রুহেলকে গ্রেনেডটি দেখায়। পরবর্তী সময়ে বদরুল আলম মিজান গ্রেনেডটিসহ তার বাসা চৌধুরী বাজারে যান এবং তার রুমের একটি ট্রাংকে তার বই খাতার মধ্যে গ্রেনেডটি রাখেন। এর ৪/৫ দিন পর মিজান বেলা ১১টার সময় মিজান (মিঠু), মোহাম্মদ আলী, বদরুলদেরকে মোবাইল করে উমেদনগর মাদ্রাসায় আসতে বলেন এবং চারজনে চৌধুরী বাজার বানিয়াচং হোটেলে বসে বৈদ্যের বাজারে শাহ্ এএমএস কিবরিয়ার সভায় গ্রেনেডটি মারবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন।২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি বেলা ৩টায় উমেদনগর মাদ্রাসা থেকে বদরুল ও মিজানকে সিএনজি করে বৈদ্যের বাজার যেতে বলেন এবং বদরুল আলম মিজান ও মোহাম্মদ আলী মোটর সাইকেলে বৈদ্যের বাজার যান। বৈদ্যের বাজারে সভার কাছাকাছি জায়গায় তারা একত্রিত হন এবং তারা মোটর সাইকেলটি অস্থায়ী চা স্টলের পাশে রাখেন। একই সময় হারিছ চৌধুরী ও অচেনা একজন একটি নীল রংয়ের মোটর সাইকেলে এসে অস্থায়ী চা স্টলের পাশে রাখা লাল মোটর সাইকেলের পাশে তাদের মোটর সাইকেল রাখেন। হারিছ চৌধুরী লাল রংয়ের মোটর সাইকেলে আসা লোকদের সাথে কথা বলেন। এরপর হারিছ চৌধুরী ও অচেনা লোকটি কিবরিয়ার মিটিং শেষ হওয়ার ২০/৩০ মিনিট পূর্বে উক্ত নীল রংয়ের মোটর সাইকেলে করে চলে যাণ। বদরুল আলম মিজান, মোহাম্মদ আলী, বদরুল ওরফে মোহাম্মদ বদরুল, মিজানুর রহমান মিজান ওরফে মিঠু একত্রে বৈদ্যের বাজার মসজিদে নামাজ পড়েন। নামাজ পড়ে এসে বদরুল আলম মিজান গ্রেনেডের প্যাকেট হতে গ্রেনেড বের করে মোহাম্মদ আলীর হাতে দিয়ে কিভাবে ছুড়তে হবে দেখিয়ে দেন। মিঠুকে রাস্তার পশ্চিম পাশে দাঁড়াতে বলেন এবং বদরুলকে রাস্তার পূর্ব দিকে দাঁড়াতে বলে দেন। সভার কাছাকাছি মোটর সাইকেলসহ বদরুল মিজান দাঁড়িয়ে থাকেন। এমন সময় মোহাম্মদ আলী মিজানের কাছে যান এবং তিনি গ্রেনেড ছুড়তে পারবেন না বলে জানালে বদরুল মিজান গ্রেনেডটি নিয়ে নেন। সন্ধ্যা অনুমান ৭টা ১০ মিনিটের দিকে জনসভা শেষ হওয়ার পর বদরুল আলম মিজান শাহ্ এএমএস কিবরিয়াকে গেটে দেখার সঙ্গে সঙ্গে কিবরিয়াকে লক্ষ্য করে গ্রেনেডটি ছুড়ে মারেন। এতে বিকট আওয়াজ হয় এবং তখনই বিদ্যুৎ চলে যায়। বদরুল আলম মিজান ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে মোটর সাইকেলের কাছে আসেন এবং মোহাম্মদ আলীসহ দ্রুত মোটর সাইকেলে হবিগঞ্জ চলে যান। গ্রেনেড বিস্ফোরণের ফলে শাহ্ এএমএস কিবরিয়াসহ পাঁচজন নিহত হন এবং ৪৩ জন আহত হন।মেয়র আরিফ ও গউছের আত্মসমর্পণ৩য় দফা সম্পূরক চার্জশিট আদালতে গৃহীত হওয়ার পর ২০১৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর আদালতে আত্মসমর্পণ করেন হবিগঞ্জ পৌর মেয়র জি কে গউছ। এর দুইদিন পর ৩০ ডিসেম্বর একই আদালতে আত্মসমর্পণ করেন সিলেট সিটি করপোরেশন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। ৩১ ডিসেম্বর আরিফুল হক চৌধুরী অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এদিকে স্থানীয় সরকার আইনে মেয়র পদ থেকে তাদেরকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।

আসামিরা কে কোথায়

কিবরিয়া হত্যা মামলার ৩৫ আসামির মধ্যে লুৎফুজ্জামান বাবর, মুফতি হান্নান, সিসিক মেয়র আরিফ, হবিগঞ্জ পৌর মেয়র জি কে গউছসহ কারাগারে রয়েছেন ১৪ জন। জামিনে রয়েছেন আব্দুল কাইয়ুমসহ আটজন। পলাতক রয়েছেন হারিছ চৌধুরীসহ ১০ জন। আর তিনজনের অব্যাহতির আবেদন রয়েছে।

মৃত্যুবার্ষিকীতে কর্মসূচি

২৭ জানুয়ারি সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার ১০ম মৃতুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা ও হবিগঞ্জে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে হবিগঞ্জের বৈদ্যের বাজারে স্মৃতিস্তম্ভে পুস্পস্তবক অর্পণ, দোয়া মাহফিল ও আলোচনা সভা। পৃথকভাবে এ কর্মসূচিগুলো পালন করবে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠন এবং কিবরিয়া স্মৃতি সংসদ। এছাড়া ঢাকায় মরহুমের গোরস্থানে সকাল ৯টায় পুষ্পস্তবক অর্পণ করবে কিবরিয়া পরিবার। তবে বড় ধরনের কর্মসূচি পালন করা হবে না বলে জানিয়েছেন কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়া।

শোক কাটেনি কিবরিয়া পরিবারের

কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের ১১ বছর অতিক্রান্ত হলেও শোক কাটেনি তাঁর পরিবারে। স্ত্রী আসমা কিবরিয়া এ ঘটনায় বিচার বিলম্বের জন্য বিভিন্ন সময় হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বিচারের আশায় বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম করেও কোনো ফল না পেয়ে হতাশা নিয়েই গত বছর বিদায় নেন পৃথিবী থেকে। শাহ এ এম এস কিবরিয়ার সন্তান ড. রেজা কিবরিয়া এ বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সময় কথা বললেও এবার কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এ ব্যাপারে তাদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আলমগীর ভূইয়া বাবুলের সাথে কথা বলতে বলেন। অ্যাডভোকেট আলমগীর ভূ¦ইয়া বাবুল ঢাকাটাইমসকে বলেন, অনেক ভয়-ভীতিকে উপেক্ষা করে ১০ বছর কষ্টের পর কিবরিয়া হত্যা মামলাকে বিচারের পর্যায়ে নিয়ে যাই। এটি একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ মামলা হওয়ায় দ্রুত বিচার আদালতে বিচারের নির্দেশ দেয়া হলেও ১৩৫ দিনে এর বিচার হয়নি। এটি দুঃখজনক। কিবরিয়ার মতো লোকের হত্যার বিচার সাধারণ কোর্টে হওয়া উচিত নয়। এখানে অনেকেরই গাফিলতি রয়েছে। যেখানে ১২ দিনে রাজন হত্যার বিচার হয়েছে সেখানে এই বিচার নিয়ে প্রহসন কেন। কিবরিয়ার স্ত্রী আসমা কিবরিয়ার কত আকুতি ছিল এই বিচার নিয়ে। কিন্তু তিনি হতাশা নিয়ে চলে গেলেন পৃথিবী থেকে। এখন মামলা নিয়ে যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে এর সমাধান কবে হবে কেউ বলতে পারছেন না। ফলে আবারও কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের বিচার অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

আহতদের আর্তনাদ

বৈদ্যের বাজার ট্র্যাজেডিতে অনেকই এখনও পঙ্গু অবস্থায় জীবন যাপন করছেন। সেই ভয়াল স্মৃতি এখনও তাদেরকে তাড়িয়ে বেড়ায়। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহির ঢাকাটাইমসকে বলেন, আমি বেঁচে থাকার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। ভারতে গিয়ে চিকিৎসা করে সুস্থ হলেও এখনও আমার গায়ে গ্রেনেডের শত স্লিন্টার। পায়ে স্টিল লাগানো। তবে আল্লাহর রহমতে বেঁচে আছি, এটাই বড় কথা।

স্ক্র্যাচে ভর দিয়ে চলাফেরা করেন আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল্লাহ সরদার। তিনি ঢাকাটাইমসকে বলেন, সেদিন বিকট শব্দের পর আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। কিছুই মনে ছিল না আর। দীর্ঘ চিকিৎসায় সুস্থ হলেও কোনোভাবে চলাফেরা করেন তিনি। গ্রেনেড হামলায় আহত অ্যাডভোকেট আব্দুল আহাদ ফারুক ঢাকাটাইমসকে বলেন, আমি অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেয়েছি। তবে শরীরের যে বেদনা বইতে হয়েছিল তা ছিল কঠিন। আল্লাহর রহমতে এখন সুস্থ আছি।

গ্রেনেড হামলায় আহত কুদ্দুছ মিয়া ঢাকাটাইমসকে জানান, আমরা অনেক কষ্টে আছি। এখন আর আমাদের খোঁজ নেয় না। তবে আমরা সরকারিভাবে অনেক সহযোগিতা পেয়েছি। ২৭ জানুয়ারির কথা স্মরণ করতেই আঁৎকে উঠেন তিনি।

অন্য নিহতদের পরিবারও চায় দ্রুত বিচার

গ্রেনেড হামলায় নিহত আব্দুর রহিমের স্ত্রী আফিয়া কাতুন ঢাকাটাইমসকে জানান, তিনি সরকারের কাছে কিছুই চান না। মৃত্যুর আগে তার স্বামী হত্যার বিচার দেখে যেতে চান।

নিহত ছিদ্দিক আলীর ছেলে কুদ্দুছ মিয়া ঢাকাটাইমসকে জানান, বিচার কাজ শুরু হলেও কবে শেষ হবে এ নিয়ে তার পরিবার হতাশ। তিনি দ্রুত এই মামলার বিচার চান।

নিহত রহিম মিয়ার কন্যা লিজা আক্তার বর্তমানে ৯ম শ্রেণিতে পড়ে। সে জানায়, তার বাবার কোনো স্মৃতিই সে মনে করতে পারছে না। যারা তাকে পিতার আদর থেকে বঞ্চিত করেছে তাদের বিচার দাবি করে লিজা।

মামলার সর্বশেষ অবস্থা

সম্প্রতি হত্যা মামলাটির বিচার শুরু হয় সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে সাক্ষ্য নেয়া সম্ভব না হওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এর কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়। আর বিস্ফোরক মামলাটি বর্তমানে হবিগঞ্জ দায়রা জজ ও বিশেষ ট্রাইবুলনাল-১ আদালতে বিচারিক কার্যক্রমের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। মামলা নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়ায় সবাই হতাশ হলেও গ্রেনেড হামলায় আহত জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহির এমপি আশাবাদী এই সরকারের আমলেই এর বিচার হবে। তবে বিচার চলাকালে যারা সাক্ষী দিয়েছেন তাদেরকে বিভিন্নভাবে আসামিরা ম্যানেজ করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কিবরিয়ার বর্ণাঢ্য জীবন

১৯৩১ সালের ১ মে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার জালালশাপ গ্রামে শাহ এ এম এস কিবরিয়া জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শিক্ষা কর্মকর্তা শাহ ইমতিয়াজ আলী। মেধাবী ছাত্র কিবরিয়া ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১ম শ্রেণিতে ১ম হয়ে অর্থনীতিতে সম্মান ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৩ সালে এইকই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১ম শ্রেণিতে ১ম হয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষায় ১ম স্থান অর্জন করে পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগ দেন। ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা কিবরিয়াকে ১৯৫৩ সালে ভাষা আন্দোলনের জন্য গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। একজন সফল কূটনীতিক হিসেবে তিনি বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি তার ক্যারিয়ারকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে বিদেশে জনমত গঠন করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুনর্গঠনের কাজে যোগ দেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯৪ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন এবং দলের উপদেষ্টা মনোনীত হন। ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই নির্বাচনে বিজয়ী হলে তিনি আওয়ামী লীগের সরকারের অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি হবিগঞ্জ-৩ (হবিগঞ্জ সদর-লাখাই) আসনে নির্বাচন করে বিজয়ী হন।

কিবরিয়া একজন ভালো লেখকও ছিলেন। তাঁর অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর সম্পাদনায় মৃদুভাষণ নামে একটি ম্যাগাজিনও প্রকাশিত হতো। কিবরিয়ার স্ত্রী মরহুম আসমা কিবরিয়া ছিলেন একজন চিত্রশিল্পী। তাঁর ছেলে ড. রেজা কিবরিয়া একজন সফল অর্থনীতিবিদ। তাঁর মাঝে অনেকেই আগামী দিনের কিবরিয়ার ছায়া দেখতে পান। মেয়ে নাজলী কিবরিয়া আমেরিকার বস্টন ইউনিভার্সিটির সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক।