রবিবার ২৩শে জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২০শে জমাদিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

হবিগঞ্জ মেডিকেল অফিসারসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে পরোয়ানা

প্রকাশঃ ০৮ মার্চ, ২০১৬

জেলাপ্রতিনিধি: Habiganj_279824745হবিগঞ্জে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মাফরোজা পারভীনের চিকিৎসায় অবহেলা ও জাজশীপের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপর হামলার ঘটনায় সদর আধুনিক হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. মঈনউদ্দিনকে প্রধান আসামি করে ১৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

মঙ্গলবার বিকেলে জজ কোর্টের নাজির ওসমান রেজাউল করিম বাদি হয়ে অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এসএম হুমায়ূন কবিরের আদালতে এ মামলা দায়ের করেন। শুনানি শেষে বিচারক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।

এদিকে, এ ঘটনায় হবিগঞ্জের বিচার বিভাগ এবং স্বাস্থ্য বিভাগের মাঝে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। আর এ নিয়ে উভয়পক্ষ পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে। হাসপাতালের এক ব্রাদারকে থানায় দেয়ার প্রতিবাদে চিকিৎসক ও কর্মচারীরা মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকে কর্মবিরতি পালন শুরু করে। বেলা ১২টায় তারা কর্মসূচি প্রত্যাহারও করে নেন।

অপরদিকে, বিচার বিভাগের কর্মচারীদের মারধরের প্রতিবাদে দুপুরে বৈঠক করেন কর্মচারী কল্যাণ সমিতি। এ নিয়ে বিচারক ও আইনজীবীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানানোর পাশাপাশি করণীয় নিয়ে বৈঠক করেছেন। এরপর বিকেল সাড়ে ৫টায় আদালতে মামলা দায়ের করা হয়।

মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণে জানা যায়, মঙ্গলবার রাত প্রায় সাড়ে ৮টার দিকে হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন হবিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মাফরোজা পারভীন। খবর পেয়ে এমএলএসএস আনোয়ার হোসেনকে তার বাসায় গিয়ে বিচারকের অবস্থা বেগতিক দেখেন।

এসময় জজ মাফরোজা পারভীন তাকে হাসপাতালে গিয়ে একজন ডাক্তার নিয়ে আসার কথা বলেন। সঙ্গে সঙ্গে আনোয়ার হাসপাতালে ছুটে গিয়ে জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত মেডিকেল অফিসার ডা. মহিউদ্দিন ও ব্রাদার হাবিবুর রহমানকে পরিচয় দিয়ে বিচারকের অসুস্থতার কথা জানান। একই সঙ্গে একজন চিকিৎসককে তার সঙ্গে দেয়ার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু তারা তাতে কোনো কর্ণপাত করেননি। কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে তিনি বিষয়টি জজশীপের নাজির ওসমান রেজাউল করিমকে মোবাইল ফোনে জানান।

খবর পেয়ে তিনি তাৎক্ষণিক হাসপাতালে ছুটে গিয়ে জরুরি বিভাগে সিভিল সার্জনের মোবাইল ফোন নম্বর চান। কিন্তু জরুরি বিভাগ থেকে বলা হয় তার নম্বর নেই। পরে তিনি অন্য একজনের স্মরণাপন্ন হয়ে মোবাইল নম্বর জোগাড় করে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

সিভিল সার্জন ডা. দেবপদ রায় জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে বিচারকের চিকিৎসার জন্য বাসায় যেতে বলেন। তখন ওই ডাক্তার নাজিরকে বলেন, তিনি সিভিল সার্জনের অধীন নন। তিনি তত্ত্বাবধায়কের অধীন।

নাজির তাকে অনুনয়-বিনয় করে তত্ত্বাবধায়কের মোবাইল নম্বর চান। কিন্তু তার কাছে তত্ত্বাবধায়কের মোবাইল নম্বর নেই বলে ডাক্তার জানান। এক পর্যায়ে সিভিল সার্জনের অনুরোধে অপর মেডিকেল অফিসার ডা. রেদওয়ান বিচারকের চিকিৎসার জন্য বাসায় যান। সেখানে গিয়ে অবস্থা সংকটাপন্ন দেখে তিনি তাকে হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন।

পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ব্রাদার হাবিবুর রহমান প্রথমে স্লিপ আনতে বলেন। এসময় কয়েকজন সহকারী জজও জরুরি বিভাগে উপস্থিত ছিলেন। এক পর্যায়ে বিচারককে মহিলা ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়ার জন্য চিকিৎসক বলেন। তখন বিচারকবৃন্দ এবং নাজির একটি কক্ষ দেয়ার জন্য অনুরোধ করলে দেয়া সম্ভব নয় বলে তারা জানায়।

এসময় নাজির রেজাউল অপারেশন থিয়েটারের পার্শ্ববর্তী অবজারভেশন রুমে সাময়িকভাবে ওই বিচারককে রাখার জন্য অনুরোধ করলে তারা জানায়, ওই কক্ষের চাবি নেই। চাবি তত্ত্বাবধায়কের সহকারী মিজানের নিকট। কিন্তু মিজানের নম্বর তাদের কাছে নেই। এ অবস্থায় জরুরি বিভাগে প্রায় ঘণ্টাখানেক বিনা চিকিৎসায়ই ওই বিচারককে রাখা হয়।

এমন পরিস্থিতিতে উপস্থিত লোকজন ব্রাদার হাবিবকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। রাতে সিভিল সার্জনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে ব্রাদার হাবিবকে থানা থেকে নিয়ে আসা হয়। পরে বিচারক মাফরোজা পারভীনকে অপারেশন থিয়েটারের পার্শ্ববর্তী অবজারভেশন রুমে নিয়ে রাখা হয় এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়।

এরপর মঙ্গলবার সকালে অসুস্থ বিচারক মাফরোজা পারভীনকে দেখতে হাসপাতালে যান জজকোর্টের নাজির ওসমান রেজাউল করিম, জারিকারক মো. জামাল মিয়া, তাজুল ইসলাম, রজব আলী ও আব্দুস সালাম, অফিস সহায়ক নূরুল ইসলামসহ কয়েকজন। তারা হাসপাতালের ভেতর প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই ব্রাদার, নার্সসহ কয়েকজন গেইট বন্ধ করে দেয়। এক পর্যায়ে তাদের উপর হামলাও করে। এতে জারিকারক জামাল মিয়া, তাজুল ইসলাম, রজব আলী আহত হন। এ সময় তারা দৌড়ে আত্মরক্ষা কারেন নাজির ওসমান রেজাউল করিম। এ ঘটনার প্রতিবাদে কর্মচারী কল্যাণ সমিতি দুপুরে জেলা জজ আদালতের সভাকক্ষে বৈঠক করেন।

এমন পরিস্থিতিতে জজশীপের বিচারকদের নিয়ে বৈঠক করেছেন জেলা ও দায়রা জজ মো. আতাবুল্লাহ। ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়েছেন আইনজীবীরাও।

সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. নজিবুল শহীদ অভিযোগ করেন, সোমবার রাত সাড়ে ৮টায় হবিগঞ্জ আধুনিক সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মাফরোজা পারভীন। হাসপাতালে পরিচ্ছন্ন কোনো কক্ষ না থাকায় তাকে পোস্ট অপারেটিভ কক্ষে রাখার ব্যবস্থা করা হয়।

কক্ষ গুছিয়ে দিতে বিলম্ব হওয়ায় জেলা জজ আদালতের নাজির ওসমান রেজাউল করিম কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মঈনের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।

বিচারক মাফরোজা পারভীনকে নির্ধারিত কক্ষে নেয়ার পর তার দেহরক্ষী পুলিশ কনস্টেবল নূরে আলম রনি কক্ষ দিতে বিলম্ব হওয়ায় উত্তেজিত হয়ে জরুরি বিভাগে কর্মরত ব্রাদার হাবিবুর রহমানকে জোরপূর্বক সদর মডেল থানায় নিয়ে যান। অবশ্য রাতেই পুলিশ হাবিবুর রহমানকে ছেড়ে দেয়। এ অবস্থায় হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মচারীরা রাতে হাসপাতালের সভাকক্ষে জরুরি বৈঠকে বসেন। তারা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতির ঘোষণা দেন।

রাত সাড়ে ১০টায় চিকিৎসক ও কর্মচারীদের সভায় উপস্থিত হন সহকারী পুলিশ সুপার মাসুদুর রহমান মনির। রাত সাড়ে ১১টায় পুলিশ কনস্টেবল নূরে আলম রনির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাসে মঙ্গলবার বেলা ১১টা পর্যন্ত কর্মবিরতি স্থগিত করেন চিকিৎসক ও হাসপাতালের কর্মচারীরা। নির্ধারিত সময়ের পর মঙ্গলবার সকাল ১১টায় তারা কর্মবিরতি শুরু করেন।

খবর পেয়ে দুপুরে হাসপাতালে ছুটে যান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শহীদুল ইসলামসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ। আশ্বাসের প্রেক্ষিতে তারা বুধবার পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত করেন।