বৃহস্পতিবার ২৭শে জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২৪শে জমাদিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

ওই ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের তত্ত্বাবধানেই চুরি হয় টাকা

প্রকাশঃ ১৭ মার্চ, ২০১৬

ডেস্কঃ2016_03_15_19_34_08_DfcovFCGwOa8sOj6VL4EMQrlZVMlf7_original2016_03_17_02_13_05_V59MY8NdhnxRDdJ4gCqb3Vrx1n8X8f_128xautoঢাকা : বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ আ্যকাউন্ট থেকে চুরি যাওয়া টাকা দ্রুততার সঙ্গে হস্তান্তরে ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকের মাকাতি সিটির জুপিটার স্ট্রিট শাখা ম্যানেজার মাইয়া সানতোস দেগুইতাকে অভিযুক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। দেশটির অ্যান্টি মানিলন্ডারিং কাউন্সিলের (এএমএলসি) কাছে জমা দেয়া ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে এ অভিযোগ আনা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বড় অংকের এ অর্থ দ্রুত হস্তান্তরে শাখা সহকর্মীদেরও সহায়তা নেন ম্যানেজার। গত ১৪ মার্চ এএমএলসির কাছে এ প্রতিবেদন জমা দেয় রিজাল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নিউইয়র্ক শাখা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের লোপাট হওয়া ৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার গত ৫ ফেব্রুয়ারি রিজাল ব্যাংকের মাকাতি সিটির জুপিটার স্ট্রিট শাখায় পাঠানো হয়। ব্যাংক শাখায় আগে থেকে ৫ অ্যাকাউন্টের ৪টিতে এ অর্থ পাঠানো হয়। জেসি ক্রিস্টোফার ল্যাগ্রোসাসের অ্যাকাউন্টে ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, আলফ্রেড ভালগারার অ্যাকাউন্টে ১৯ দশমিক ৯৯৯ মিলিয়ন, এনরিকো ভাসকোয়েজের অ্যাকাউন্টে ২৫ মিলিয়ন এবং মাইকেল ক্রুজের অ্যাকাউন্টে ৬ মিলিয়ন পাঠানো হয়।

এএমএলসি প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ব্রাঞ্চ ম্যানেজার দেগুইতা সেঞ্চুরিটেক্স ট্রেডিংয়ের মালিক উইলিয়াম গো’র নামে জুপিটার ষ্ট্রিটের ওই শাখায় একটি অ্যাকাউন্ট খুলতেও সহায়তা করেন। ওই অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে চুরির এ অর্থ লেনদেন হওয়ার প্রমাণ রয়েছে।

বিপুল অংকের এ অর্থ লেনদেনের ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর সংবাদ সম্মেলন করে উইলিয়াম গো’র পক্ষে তার আইনজীবী দাবি করেন, ওই অ্যাকাউন্টটি খোলার সময় তার সই নেয়া হয়নি। অর্থ লেপাটের সঙ্গে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার দেগুইতার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে কোন অভিযোগ করেননি তিনি। তার প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার কথা দেগুইতা পরে তার কাছে স্বীকার করেছেন বলে জানান এ ব্যবসায়ী। ব্যাংক জালিয়াতির এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে থাকার অনুরোধ জানিয়ে দেগুইতা তাকে স্থানীয় মুদ্রায় ১০ মিলিয়ন পেসো ঘুষ দেয়ার প্রস্তাব করেন। অবশ্য উইলিয়াম গো’র এ বক্তব্য অস্বীকার করেন রিজাল ব্যাংক ম্যানেজার দেগুইতা।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে রিজাল ব্যাংক শাখায় ডলার আসার দিন ৫ ফেব্রুয়ারি ল্যাগ্রোসাসের অ্যাকাউন্ট থেকে ২২ দশমিক ৭৩ মিলিয়ন ডলার সরানো হয় ব্যবসায়ী উইলিয়াম গো’র হিসাবে। উইলিয়াম গো ওই টাকা থেকে ১৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার পাঠান বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন প্রতিষ্ঠান ফিলরেমের অনুকূলে।

এএমএলসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ল্যাগ্রোসাসের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা উত্তোলনে ব্যবহৃত স্লিপ, স্থানান্তর ফরম এবং ব্যাংক ম্যানেজারের কাছে করা দরখাস্তে অ্যাকাউন্ট হোল্ডার উইলিয়াম গো’র সই পাওয়া যায়নি। ওই দিন সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিট থেকে ৭টা ৪ মিনিটের মধ্যে সন্দেহজনক এসব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লেনদেন স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়ে রিজাল ব্যাংকে বার্তা আসে যুক্তরাষ্ট্র ফেডারেল বিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক থেকে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, লেনদেনের সময় রিজাল ব্যাংক কর্মকর্তা নেস্তর পায়েন্দা, ব্রিগেত্তি ক্যাপেনা, মাইয়া দেগুইতা ও রাউল তানের মধ্যে টেলিফোনে কথা হয় দফায় দফায়। গোয়েন্দা সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার দেগুইতা বলেছেন, অ্যাকাউন্ট হোল্ডাররা তার দীর্ঘদিনের পরিচিত। এসব অ্যাকাউন্টে গত বছর থেকে বড় তহবিল জমার আশা করছিলেন তিনি।
জাপান যাওয়ার পথে এয়াপোর্টে (ডানে দেগুইতা)

অ্যাকাউন্ট থেকে লেনদেন স্থগিত রাখার বার্তা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বের করে শুক্রবার ৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৭টার পর। পরের দুইদিন শনি ও রোববার ছিল সাপ্তাহিক ছুটি। চীনা নববর্ষ উদযাপনে ছুটি ছিল সোমবারও।

গত ৯ ফেব্রুয়ারি রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনকে (আরসিবিসি) বার্তা পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই বার্তায় ব্যাংকের সন্দেহজনক ৪ অ্যাকাউন্টের লেনদেন স্থগিত রাখার পাশাপাশি ওইসব অ্যাকাউন্টে থাকা অর্থ জব্দেরও অনুরোধ জানায়। ওই দিনই রিজাল ব্যাংকের জুপিটার শাখার ৪ অ্যাকাউন্ট থেকে ৫৮ দশমিক ১৫ মিলিয়ন ডলার তুলে নেয়া হয়। মধ্যাহ্ন বিরতির আগেই রিজাল ব্যাংকের সেটেলমেন্ট ডিপাটমেন্ট থেকে জুপিটার স্ট্রিট শাখায় উত্তোলন করা অর্থ ফেরৎ চেয়ে ৫টি ই-মেইল পাঠানো হয়।

অবশ্য ব্যাংকের শাখা ম্যানেজার মাইয়া দেগুইতা বলেছেন, ওই ৫টি ই-মেইল এসেছিল ব্যাংকের আঞ্চলিক বিপণন প্রধান ব্রিগিত্তি কাপেনার অফিস থেকে। ই-মেইলে বলা হয়েছে, সব অ্যাকাউন্ট ঠিক আছে। টাকা উত্তোলন ও অন্যত্র স্থানান্তর কার্যক্রম দেখভাল কাস্টমার সার্ভিস বিভাগের সহকারী রেমাট মারবেলা এবং অনুমোদন করেছে ওই বিভাগের সিনিয়র কর্মকর্তা অ্যাঞ্জেলা তরেস।

অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলতে কাস্টমার সার্ভিস ডিপাটমেন্টের এ সহায়তা প্রতীয়মান হয় যে, শাখা ব্যবস্থাপক মাইয়া দেগুইতাসহ ওই শাখার সব কর্মকর্তা মানিলন্ডারিংয়ের এ তৎপরতার সঙ্গে জড়িত।

বিচার বিভাগের কাছে অ্যান্টি মানিলন্ডারিং কাউন্সিলের দেয়া তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংক ম্যানেজার দেগুইতা আগে থেকেই জানতেন যে, ওই শাখার চার অ্যাকাউন্টে জমা অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ব ব্যাংকে গচ্ছিত বাংলাদেশ ব্যংকের রিজার্ভ অ্যাকাউন্ট থেকে চুরি করা। এটা জেনেও এ অর্থ ভুয়া অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদের নির্বিঘ্নে তুলে নেয়ার সুযোগ দিয়েছেন। এএমএলসির উপ-পরিচালক জুলিয়া ব্যাকে-আবাদ এবং রাফায়েল এসজালুজের সই করা তদন্ত প্রতিবেদনে এ অভিযোগ করা হয়।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ব ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে গচ্ছিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ অ্যাকাউন্ট থেকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি ১০১ মিলিয়ন ডলার খোয়া যায়। এ অর্থের ৮১ মিলিয়ন যায় ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকের জুপিটার স্ট্রিট শাখায়। সেখান থেকে তুলে ফিলিপাইনের ক্যাসিনোর মাধ্যমে বৈধ করা হয়। একটি অংশ বিদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে বলে তদন্তে উঠে আসে।

বাকি ২০ মিলিয়ন ডলার পাঠানো হয় শ্রীলংকার একটি ব্যাংকে। প্রাপক সংগঠনের নামের বানানে ভুল থাকায় ব্যাংক কর্মকর্তারা আটকে দেন ওই অর্থ। তথ্যসূত্র: দ্য ইনকোয়ারার